Thursday, February 27, 2025

বেসামাল ক্রিকেট বোর্ড, দায় কি শুধু ক্রিকেটারদের?


 চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি শুরু হতে আর দশ দিনেরও কম বাকি। ইতিমধ্যেই টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিয়েছে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ। দুই দলই হেরেছে দুটি করে ম্যাচ। যুদ্ধ যে হেরে গেছে তা নয়। বলা যায়, ভারতের দুই পাশের দুটি দেশই আসলে আত্মসমর্পণ করেছে। মিল শুধু ক্রিকেটের দৃশ্যেই নয়, উভয় দেশের উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিবেশেও প্রসারিত। প্রশ্ন হল, ক্রিকেটে কি রাজনীতির প্রভাব আছে? রাজনৈতিক অস্থিরতাও কি পাকিস্তান-বাংলাদেশ ক্রিকেটের সামগ্রিক পতনে ভূমিকা রেখেছে?

গত বছর রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ‘স্বাধীনতা’ দাবি করে। তবে স্বাধীনতার স্বাদ একটু তিক্ত হতে শুরু করেছে বলে মনে করছেন কেউ কেউ।  ইউনূসের "নতুন" বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখে অনেকেই জেগে উঠেছেন। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর পদত্যাগের দাবিতে রাস্তায় নেমেছে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা। গত বছর আগস্টের ‘বিপ্লবের’ কারণে সাধারণ মানুষের অবস্থা একেবারে ‘স্বর্গ বিদায়’।

ক্রিকেটের ক্ষেতেও ব্যতিক্রম কিছি নেই। সোশ্যাল মিডিয়াতে গর্জন চলতে থাকে, কিন্তু পারফরম্যান্স অদৃশ্য হওয়ার পথে। কিন্তু বাংলাদেশ ক্রিকেটের নতুন দিনের শুরুটা ভালোই ছিলো। পাকিস্তানের মাটিতে গিয়ে টেস্টে সিরিজ জয়ের পরেও শূন্যতা ছাড়া ঝুলিতে কিছুই নেই। অবশেষে, চ্যাম্পিয়নশিপ ট্রফি এই ব্যথার প্রতিফলন। 

রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে পরিবর্তন এসেছে। পাপনের আমলেও সাকিব খুব একটা উন্নতি করতে পারেননি। কিন্তু অন্তত তারা একটা সম্ভাবনা, একটা বিশ্বাস তৈরি করে। ভারতের বিপক্ষেও জিতেছে কয়েকটি ম্যাচে। কিন্তু এটা কঠিন যদি এটাকে সাফল্যের চূড়া হিসেবে ধরা হয়। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জেতার চেয়ে ভারতকে হারানোটাই ছিলো গুরুত্বপূর্ণ। পালাবদলের পর যে ভারতবিদ্বেষ প্রধান উপাদান হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেটা ক্রিকেট সমর্থকদের হাবেভাবে তা স্পষ্ট। নিউজিল্যান্ডের কাছে হারের পর বিদায় নেওয়া মুস্তাফিজুরদের পারফরম্যান্স খুব একটা হতাশ করেনি। শান্ত যতই চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জেতার জন্য এসেছি বলে আসুন না কেন, বাস্তবের চিত্রটা আদৌ সেরকম নয়।


সাকিবকে নিয়ে হাজারো জলঘোলা আছে। তাকে খেলতে দেওয়া হবে কিনা সে সিদ্ধান্ত নিতে তারা অনেক সময় নিয়েছে। তামিমের ক্ষেত্রেও তাই। পুড়িয়ে দেওয়া হয় মাশরাফি মুর্তজার বাড়ি। যদিও তিনি বাংলাদেশের একজন ‘লিজেন্ড’ ক্রিকেটার। যে কোনো ক্রিকেটারই নিরাপত্তাজনিত সমস্যায় ভুগতে পারেন কারণ রাজনৈতিক পরিবর্তনটা ছিলো খুবই ভয়াবহ। বিসিবিতে কেউ কি পরিষ্কার তথ্য দিতে পারবেন? বেশিরভাগ দল যখন চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন বাংলাদেশ তাদের 'বিপ্লব' নিয়ে ব্যস্ত। মাঝে মাঝে ‘বিপিএল’ নিয়ে বড় নাটক হয়। ভক্ত থেকে শুরু করে ক্রিকেটার, যন্ত্রণাদায়ক দৃষ্টি সবার কাছেই স্পষ্ট। মুশফিকরা নতুন উদ্যমে নামার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু হাকিম সরে গেলেও আদেশ হয়নি। সেই তিমির ওপর শুয়ে আছে বাংলাদেশ। ক্রিকেটের ক্ষেত্রেও তাই।

বাংলাদেশে কয়েক মাস ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছে। পাকিস্তানে, এটি একটি পুরানো গল্প। তারা দীর্ঘদিন ধরে চরমপন্থীদের আগ্রাসনের মধ্যে বসবাস করছে। প্রায় প্রতি দশকেই সেখানে আন্দোলন হয়। ইমরান খান সম্প্রতি জেলে গেছেন। ইমরান তাদের অধিনায়ক ছিলেন এবং পরে প্রধানমন্ত্রী হন। পাকিস্তানের একমাত্র বিশ্বকাপ জয় ছিল তার হাতে। ইমরানের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছিলেন আকরাম, ইনজামাম ও ইউনুস খান। এখন তারা আদি প্রস্তর যুগের ঘটনাগুলির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট যুদ্ধের লাঠিও অনেকদিন ধরেই তাদের হাতেই ছিলো। আর এখন ভারতের জয় স্বাভাবিক, অন্যথায় এটি আশ্চর্যজনক বলে মনে হয়।


ইতিমধ্যেই পাকিস্তান থেকে বলা হচ্ছে, এই অধঃপতনের জন্য একমাত্র ইমরান দায়ী। তিনিই নাকি ঘরোয়া ক্রিকেটে রাজনীতি ও স্বজনপোষণ ঢুকিয়েছেন। ধরে নেওয়া যাক এই অভিযোগ সত্য। কিন্তু সেখানে থেকে উত্তরণের পথ কি? কেউ খুঁজেছে? আর বর্তমানে যিনি পিসিবি-র চেয়ারম্যান, সেই মহসিন নকভি আবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। অর্থাৎ হাতে ক্ষমতার অভাব নেই। তাহলে কি সদিচ্ছার অভাব? চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি আয়োজনে চূড়ান্ত দুর্দশা চলছে। রাষ্ট্রের সাহায্য পেয়েও এত দৈন্যদশা কেন? প্রশ্ন অনেক, উত্তর অজানা। আদৌ সেই সমস্যার সমাধান আছে কিনা কেউ জানে না। দেনায় ডুবে আছে পাকিস্তান। মূল্যবৃদ্ধি আকাশচুম্বী। এই পরিস্থিতিতে ক্রিকেটের সাফল্য দিয়ে কিছুদিন চুপ রাখানো যায়। কিন্তু বোর্ডের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবে ক্রমশ গোলিয়াথ থেকে ডেভিডে পরিণত হয়েছে পাক ক্রিকেট।

তাহলে প্রশ্ন উঠবে, রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে আফগানিস্তান কীভাবে সাফল্য পাচ্ছে? বিশেষজ্ঞ মহল একাধিক যুক্তি দিচ্ছে। প্রথমত, আফগানিস্তানের অধিকাংশ ক্রিকেটার দেশের বাইরে থাকেন। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে খেলে বেড়ান। তাছাড়া আফগানিস্তানের উত্থান ঘটেছে সম্প্রতি। এখনও বিরাট কোনও সাফল্য অর্জন করেনি। ফলে তাদের পরীক্ষা বাকি রয়েছে। রশিদরা অন্তত ক্ষুধা দেখাতে পেরেছেন ভালো কিছু করার। নিজেদের প্রমাণ করার। পাকিস্তান বা বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের মধ্যে আজ সেটুকুরও অভাব। ভারতের দুপাশে দুই দেশ। দুজনেই সমান তালে অধঃগামী।

No comments:

Post a Comment

Popular Feed

Recent Story

Featured News

Back To Top